💖 “তোমার চোখে আমি”


পর্ব–১ :

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনের বারান্দায় বিকেলের নরম আলো এসে পড়েছে। গ্রীষ্মের শেষ দুপুর, চারদিকে অদ্ভুত শান্ত অথচ প্রাণবন্ত পরিবেশ। ছাত্রছাত্রীদের হাসি-ঠাট্টা, চায়ের কাপে টুংটাং শব্দ, আর বাতাসে ভেসে আসা গানের সুর।

রাফি ব্যাগ কাঁধে ঝুলিয়ে সিঁড়ি বেয়ে নামছিল। সকাল থেকে একটানা তিনটা ক্লাস করে এসেছে, মাথা ক্লান্ত। কিন্তু মনে উচ্ছ্বাস—কারণ আজ নতুন একটা বই হাতে পেয়েছে। সেলিম আল দীন-এর নাটকের সংকলন।

ঠিক তখনই সিঁড়ির বাঁকে হঠাৎ সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এক মেয়েকে দেখল। লাল সালোয়ার-কামিজে সেজে থাকা সেই মেয়ে খাতায় আঁকিবুকি করছে। খোলা চুল বাতাসে উড়ছে। কিন্তু যেটা রাফিকে সবচেয়ে বেশি টানল, তা হলো মেয়েটির চোখ। গভীর, স্বচ্ছ, আর দুঃখভরা।

রাফি অচেতনভাবে থেমে দাঁড়াল। সময় থেমে গেছে যেন।

—“একটু সরবেন?” মেয়েটি ঠান্ডা স্বরে বলল।

—“ওহ, সরি! খেয়াল করিনি।” রাফি হকচকিয়ে সরে দাঁড়াল।

মেয়েটি পাশ কাটিয়ে চলে গেল। কিন্তু যাওয়ার সময় এক অদ্ভুত আতরের গন্ধ ভেসে এল। সেই গন্ধ বুকের ভেতরে অচেনা কাঁপন তুলল।


পরদিন টিএসসির চায়ের দোকানে বসেছিল রাফি। দূরে হঠাৎ চোখে পড়ল সেই একই মেয়ে। এবারও খাতায় ছবি আঁকছে।

—“দেখ নিশাত, ওই মেয়েটাকে চিনিস?” রাফি বন্ধু নিশাতকে বলল।

—“ও তো আমাদের চারুকলার ছাত্রী। নাম তাহসিন।”

রাফি ফিসফিস করে বলল,
—“তাহসিন…”

মনে হলো নামটাতেও এক ধরণের সুর আছে।


সন্ধ্যায় কলাভবনের সামনে সাহস করে এগিয়ে গেল রাফি।

—“আসলে সেদিন অসাবধানতায় পথ আটকে দাঁড়িয়েছিলাম। এজন্য আবারও দুঃখিত।”

তাহসিন এক দৃষ্টিতে তাকাল।
—“এতদিন পর ক্ষমা চাইতে এলেন?”

—“মনে হচ্ছিল না বললে ঠিক হবে না।”

মেয়েটি হেসে ফেলল।
—“আপনি সাহিত্য বিভাগে পড়েন, তাই তো?”

—“হ্যাঁ। আর আপনি চারুকলা।”

সেদিন থেকেই আলাপের শুরু।


একদিন তাহসিন তার আঁকা ছবি দেখাল।
—“এটা চোখ… কিন্তু চোখের ভেতরে একটা গল্প আছে।”

রাফি ছবিটার দিকে তাকিয়ে বলল,
—“আপনার চোখেও গল্প আছে। আসলে, পুরো একটা মহাবিশ্ব।”

তাহসিন চুপ করে রইল। হয়তো প্রথমবার কেউ তার ভেতরের দুনিয়াটা দেখল।

দিন যেতে লাগল। কখনো টিএসসিতে চা, কখনো লাইব্রেরিতে বইয়ের আড্ডা। দুজনের ভুবন আলাদা হলেও, কোথাও যেন মিলে যাচ্ছিল।

রাতের ডায়েরিতে রাফি লিখল:
"আজ আবার তাহসিনকে দেখলাম। মনে হলো, আমি তার চোখের ভেতরে হারিয়ে যেতে চাই।"

👉 এখানেই পর্ব–১ শেষ।


পর্ব–২ : 

সময় গড়াল। তাদের বন্ধুত্ব গভীর হলো। কিন্তু গভীরতার সাথে সাথে তৈরি হলো অদ্ভুত দ্বিধা।

রাফি প্রায়ই চাইত তাহসিনকে বলে ফেলতে—
"আমি তোমায় ভালোবাসি।"
কিন্তু মুখ খুলতে পারত না। ভয় করত, হয়তো এ বন্ধুত্ব নষ্ট হয়ে যাবে।


এক বিকেলে কলাভবনের সামনে হঠাৎ রাফি দেখল, তাহসিনের পাশে দাঁড়িয়ে আছে এক ছেলে। চারুকলার জুনিয়র, নাম অরিন্দম। সে হাসতে হাসতে কিছু বলছিল, আর তাহসিনও হেসে উঠছিল।

রাফির বুক কেঁপে উঠল। অচেনা হিংসা আর অস্বস্তি তাকে গ্রাস করল।

সেদিন রাতে রাফি তাহসিনকে মেসেজ দিল না। ফোনও করল না।

পরদিন তাহসিন নিজেই জিজ্ঞেস করল—
—“আপনি কালকে হঠাৎ উধাও হয়ে গেলেন কেন?”

রাফি এড়িয়ে গেল।
—“কিছু না। ব্যস্ত ছিলাম।”

তাহসিন চোখে চোখ রাখল।
—“আপনি কি মনে করেন আমি সবাইকে আপনার মতো কথা বলি?”

রাফি চুপ করে গেল।


কয়েকদিন কথা কমে গেল। দেখা হলেও হাসি ফিকে হয়ে আসত। রাফির বুকের ভেতরে ভয় জমতে লাগল—সে কি তাহসিনকে হারাচ্ছে?

একদিন নিশাত বলল,
—“তুই যদি ওকে সত্যি পছন্দ করিস, তাহলে বলে ফেল। চুপ থাকলে তো দূরে সরে যাবে।”

রাফি ভেতরে ভেতরে দ্বন্দ্বে ভুগতে লাগল।


মে মাসের শেষ সপ্তাহে হঠাৎ কালবৈশাখী ঝড় উঠল। ক্যাম্পাসের সব গাছ কাঁপছে। বৃষ্টি ঝরছে ঝমঝম করে।

তাহসিন ভিজে ছাতা ছাড়াই দৌড়ে টিএসসির বারান্দায় এসে দাঁড়াল। ভিজে চুল গায়ে লেপ্টে আছে।

রাফি তখনই বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিল। দুজনের চোখে চোখ পড়ল।

এক মুহূর্ত নীরবতা।

—“আপনি তো ভিজে যাচ্ছেন।” রাফি বলল।

তাহসিন হেসে ফেলল।
—“ভিজতেই তো দৌড় দিলাম। ভিজলে মনে হয় মনও ধুয়ে যায়।”

রাফি তাকিয়ে থাকল তার ভেজা মুখের দিকে। বুকের ভেতরে চাপা ভালোবাসা যেন ঝড়ের মতো ফেটে বেরোতে চাইছিল।

কিন্তু সে বলল না। শুধু চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।


পরের দিন থেকেই তাহসিন কিছুটা দূরে সরে গেল। হয়তো রাফির নীরবতা তাকে কষ্ট দিয়েছিল।

রাফি বুঝল, সে দেরি করে ফেলছে। যদি এখন না বলে, তবে হয়তো সবকিছুই হাতছাড়া হয়ে যাবে।

রাতে ডায়েরিতে লিখল:
"কালকে বলব। যাই হোক, তাকে আর হারাতে চাই না।"

👉 এখানেই পর্ব–২ শেষ।


পর্ব–৩ :

তাহসিন দূরে সরে যাওয়ার পর রাফির ভেতরটা অস্থির হয়ে উঠল। প্রতিদিন ক্লাসে গেলেও মন বসত না। লাইব্রেরির বই খুলে রাখলে অক্ষরগুলো চোখে আসত না। সবকিছু মিলিয়ে এক ধরণের শূন্যতা তাকে গ্রাস করল।

নিশাত একদিন বলল—
—“তুই যদি ওকে না বলিস, তোকে সারাজীবন আফসোস করতে হবে। জীবনটা সিনেমা না, যেখানে সবকিছু শেষ মুহূর্তে জাদুর মতো ঠিক হয়ে যায়।”

রাফি চুপ করে গেল। কিন্তু মনে মনে ঠিক করল—এবার আর দেরি নয়।


রাত জেগে রাফি একটা চিঠি লিখল।

"তাহসিন, জানি হয়তো আমি তোমার জন্য কিছুই নই। তবুও বলতে চাই, যেদিন প্রথম তোমাকে দেখেছি, মনে হয়েছে তোমার চোখের ভেতরে আমি নিজের জন্য একটা জায়গা খুঁজে পেয়েছি। যদি পারো, আমাকে তোমার ছবির পাশে এক টুকরো রং হয়ে থাকতে দিও।"

চিঠিটা ভাঁজ করে ব্যাগে রেখে দিল। ঠিক করল, কালকে গ্যালারিতে গিয়ে সরাসরি দেবে।


চারুকলায় সেদিন ছিল এক্সিবিশন। ছাত্রছাত্রীদের আঁকা ছবি দেয়ালে সাজানো। ভিড় জমেছে, সবাই উৎসাহ নিয়ে ছবি দেখছে।

রাফি ভিড় ঠেলে ঢুকল। তার চোখ শুধু একটাকে খুঁজছিল—তাহসিন।

হঠাৎ এক কোণায় দেখল, তাহসিন দাঁড়িয়ে আছে তার আঁকা ছবির পাশে। ছবিটা চোখের—গভীর, আবেগমাখা। নিচে ছোট্ট করে লেখা: “In every eye, there is a hidden story.”

রাফি এগিয়ে গেল। বুকের ভেতর ধুকপুকানি বেড়ে গেল।

—“তাহসিন…”

তাহসিন ঘুরে তাকাল। তার চোখে ক্লান্তি, আবার অদ্ভুত কোমলতা।

রাফি কাঁপা গলায় বলল,
—“আমি কিছু দিতে চাই।”

চিঠিটা এগিয়ে দিল।

তাহসিন চুপচাপ চিঠিটা নিল, কিন্তু খুলল না। কিছুক্ষণ পর ধীরে বলল—
—“এখন পড়ব না। বাসায় গিয়ে পড়ব।”


সেদিন রাতে রাফি ঘুমোতে পারল না। বারবার মনে হচ্ছিল, তাহসিন চিঠিটা পড়েছে কি না। পড়লে কেমন প্রতিক্রিয়া দিয়েছে?

ভোরে মোবাইল ভাইব্রেট করল। এক লাইন মেসেজ—

"ক্যাম্পাসে পুরনো গাছটার নিচে আসবেন, সকাল নয়টায়।"

রাফির বুক কেঁপে উঠল।


সকালটা কুয়াশামাখা। ক্যাম্পাসের পুরনো বটগাছটার নিচে দাঁড়িয়ে রাফি। তার হাত ঘামছে, বুক ধড়ফড় করছে।

তাহসিন এল কিছুক্ষণ পর। সাদা সালোয়ার-কামিজে সেজে, হাতে খাতা নেই। চোখে অদ্ভুত শান্তি।

—“চিঠিটা পড়েছি।”

রাফি কাঁপা কণ্ঠে বলল,
—“তাহলে…?”

তাহসিন কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর ধীরে বলল,
—“আপনি জানেন, আমি সহজে কাউকে বিশ্বাস করতে পারি না। অনেক ভেতরের কষ্ট আছে। কিন্তু আপনার চোখে আমি কোনো প্রহেলিকা দেখিনি। সেখানে শুধু সত্যি দেখেছি। তাই…”

সে থেমে গেল।

রাফি নিঃশ্বাস আটকে রইল।

তাহসিন ফিসফিস করে বলল,
—“তাই আমি চাই, আপনি আমার ছবির পাশে থাকুন। রঙ হিসেবে নয়, আসল মানুষ হিসেবে।”

রাফির বুক ভরে উঠল আনন্দে। তার মনে হলো, পুরো দুনিয়া হঠাৎ আলোয় ভরে গেছে।


বটগাছের নিচে দুজন চুপচাপ বসে রইল। আশেপাশে পাখির ডাক, দূরে ক্লাসের ঘণ্টা বাজছে।

রাফি ধীরে বলল,
—“জানেন, প্রথম দিন থেকেই ভেবেছিলাম, আপনার চোখের ভেতরে হারিয়ে যেতে চাই।”

তাহসিন হেসে উত্তর দিল—
—“তাহলে হারিয়ে যান। আমি খুঁজব না।”

দুজনেই হেসে উঠল।

সেদিন থেকে তাদের জীবন নতুন রঙে ভরে গেল। হয়তো পথে বাধা আসবে, হয়তো ভুল বোঝাবুঝিও। কিন্তু তারা জানত—চোখের ভেতরে যে গল্প শুরু হয়েছে, সেটা কখনো শেষ হবে না।


সমাপ্তি।